যাত্রাবাড়ী থানার পাশে আবাসিক হোটেল ‘তাজে’ চলছে রমরমা দেহ ব্যবসা ও নারী পাচার

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজধানী ঢাকায় দিন দিন বাড়ছে অবৈধ আবাসিক হোটেলের সংখ্যা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অসংখ্য হোটেল-গেস্টহাউস চলছে মানবপাচার ও দেহ ব্যবসার আখড়া হিসেবে। ঠিক এমনই এক ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে যাত্রাবাড়ী থানার খালপাড় এলাকায় অবস্থিত ‘হোটেল তাজ’।

মাদ্রাসার পাশেই চলছে অসামাজিক ব্যবসা

যাত্রাবাড়ীর অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসার পাশেই গড়ে উঠেছে ‘আবাসিক হোটেল তাজ’। ধর্মীয় শিক্ষার পবিত্র পরিবেশের পাশে এভাবে দেহ ব্যবসা চলতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ— প্রতিদিন দিনরাত ২৪ ঘণ্টা হোটেলটিতে নারী পাচার ও অনৈতিক কার্যকলাপ চলে, অথচ প্রশাসনের কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।

মূল হোতা আক্তার–কনক–জাহিদ

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই অবৈধ ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রক তিনজন— আক্তার, কনক ও জাহিদ। তাদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে বিশাল এক নারী পাচার চক্র। কনক ও জাহিদ দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে নারী পাচারের সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নারীদের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে পাচার করে দেয় বিভিন্ন দেশে। পাচার হওয়া নারীরা পরবর্তীতে পড়েন ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে— কেউ ফিরতে পারেননি, কেউ আবার নির্যাতনের শিকার হয়ে নিখোঁজ হয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি শুধু যাত্রাবাড়ীতেই নয়, রাজধানীর উত্তরায় ‘ওয়ান স্টার’, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, এমনকি দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায়ও একাধিক হোটেল পরিচালনা করছে। প্রতিটি হোটেলেই চলে একই ধরনের অবৈধ ব্যবসা— দেহ ব্যবসা, নারী পাচার ও মাদক কারবার।

কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য

প্রতিদিন হোটেল তাজে ঢোকানো হয় অসংখ্য নারী ও তরুণীকে, যাদের অনেকেই গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সদস্য। তাদের মধ্যে কেউ চাকরির আশায় আসে, কেউ আসে অজান্তেই প্রতারণার ফাঁদে পড়ে। পরে তাদের জিম্মি করে রাখা হয়, হুমকি দিয়ে বাধ্য করা হয় অনৈতিক কাজে। এই চক্রের দৈনিক আয় লাখ টাকায় পৌঁছায় বলে জানা গেছে, আর সেই অর্থ ভাগ হয়ে যায় আক্তার–কনক–জাহিদের সিন্ডিকেটে।

স্থানীয়দের দাবি, এদের পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী কিছু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তি, যাদের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ ব্যবসা চলছে। ফলে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন।

পুলিশের বক্তব্য

এ বিষয়ে যাত্রাবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জানান, “আমি যতদিন এই থানায় আছি, ততদিন কোনো অবৈধ কার্যকলাপ চলতে দেব না। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ওসি আরও বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযানে যাচ্ছি। খবর পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কেউ যদি অপরাধীদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়, তার পরিচয় গোপন রেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এলাকাবাসীর দাবি

স্থানীয়রা জানান, পুলিশ মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও কয়েকদিনের মধ্যেই আবার হোটেলটি চালু হয়ে যায়। এই সিন্ডিকেটের অর্থ ও প্রভাব এত বেশি যে, অল্প সময়ের মধ্যেই তারা পুরনো ব্যবসা নতুন নামে চালু করে।
একজন এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বারবার প্রশাসনকে জানিয়েছি। কিন্তু রাতের অন্ধকারে সব আবার আগের মতো হয়ে যায়। এটা আমাদের সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ বার্তা।”

দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, রাজধানীর প্রতিটি আবাসিক হোটেল এখন যাচাইয়ের আওতায় আনা উচিত। যাত্রাবাড়ী থানার হোটেল তাজসহ রাজধানীর সন্দেহভাজন হোটেলগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে নারী পাচার সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করা জরুরি। পাশাপাশি, এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকদেরও বিচারের মুখোমুখি করা দরকার।

এলাকাবাসীর একটাই দাবি—

“আক্তার, কনক ও জাহিদের নেতৃত্বে চলা এই দেহ ব্যবসা ও নারী পাচার চক্রের স্থায়ীভাবে অবসান চাই। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে প্রশাসন যেন কঠোর ব্যবস্থা নেয়।”

নিউজটি আপনার স্যোসাল নেটওয়ার্কে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *