
স্টাফ রিপোর্টার:-
কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর থানাধীন আমড়াতলী ইউনিয়নের দুতিয়া দিঘির পাড় গাউছিয়া সুন্নিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানায় নাজেরা বিভাগের ১১ বছর বয়সী ছাত্র সামিউলের রহস্যজনক মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান পুরো আমড়াতলী ইউনিয়ন। মৃত্যুর সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে পরিবার ও এলাকাবাসীর ক্ষোভ এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন স্থানীয়রা।
ঘটনার বিবরণ
গত ২৯ অক্টোবর বুধবার সকালে মাদ্রাসায় সন্তানকে দেখতে গিয়ে সামিউলকে না পেয়ে তার খোঁজ শুরু করেন বাবা আমিনুল ইসলাম। মাদ্রাসার শিক্ষক ফয়সাল হুজুর প্রথমে জানান, সামিউল গতকাল বাড়িতে গেছে। কিন্তু পরিবার জানায়, সামিউল বাড়িতে আসেনি।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখানোর দাবি জানালে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র ২৭ তারিখ বিকেল ৪টার মাঠের খেলাধুলার ভিডিও দেখান। কিন্তু ২৭ তারিখ রাত এবং ২৮-২৯ তারিখের ফুটেজ দেখাতে ব্যর্থ হন তারা। এ নিয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও সামিউলের বাবার মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।
পরে মাদ্রাসার ড্রেনের পাশ থেকে সামিউলের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পুলিশ মাদ্রাসা তালাবদ্ধ রাখে এবং কোনো মিডিয়াকর্মীকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
পরিবারের অভিযোগ
মৃত সামিউলের বাবা-মা জানান, তিন বছর ধরে সামিউল এই মাদ্রাসায় কোরআন শিক্ষা নিচ্ছিল। বাবা প্রবাসী হওয়ায় সে মাদ্রাসার আবাসিক ছাত্র ছিল। মাঝে মাঝে দাদি মাদ্রাসায় গিয়ে তাকে দেখতেন ও খরচের টাকা দিয়ে আসতেন।
গত ২৫ অক্টোবর শনিবার মাদ্রাসায় একটি মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সামিউলের সাথে তার বাবা শেষবারের মতো দেখা করেন। মাত্র চার দিন পর রহস্যজনক পরিস্থিতিতে সন্তানের মৃত্যু ঘটে।
পরিবার অভিযোগ করেছে, মাদ্রাসায় অথবা ড্রেনের কাছে সামিউলকে গলা চিপে বা গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার পর গরম পানি বা রাসায়নিক পদার্থ ঢেলে দেওয়া হয়েছে।
সামিউলের মায়ের ভাষ্যমতে, মৃতদেহের অবস্থা ছিল অস্বাভাবিক:
মুখ দিয়ে জিহ্বা বের হয়ে ছিল
পুরো শরীর অস্বাভাবিকভাবে ফোলা
চামড়ায় ছিদ্র এবং কিছু জায়গায় চামড়া উঠে গিয়েছিল
শরীরে লাল লাল দাগ
দুই হাতের চামড়া উঠে গিয়েছিল এবং হাত দুটি উপরের দিকে তোলা অবস্থায়
দুই পা দুই দিকে ছড়ানো ও নিচের দিকে বাঁকা
“আমার ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি দেশবাসী, সকল প্রশাসন এবং মিডিয়ার কাছে আমার ছেলের বিচার চাই,” বলেন শোকাহত বাবা আমিনুল ইসলাম।
প্রশাসনের অবস্থান
স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ও সিআইডি ফরেনসিক রিপোর্ট আসার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। সঠিক তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
এদিকে পরিবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, কোনো মহল মেডিকেল রিপোর্ট বিকৃত করতে পারে। তারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ শুরু করেন এলাকাবাসী। পুলিশ তাদের প্রতিবাদ থামিয়ে আশ্বাস দেয় যে সামিউলের মৃত্যুর সঠিক বিচার নিশ্চিত করা হবে।
এলাকাবাসী ও আত্মীয়স্বজনদের দাবি, সঠিক তদন্ত করে দ্রুত দোষীদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা হোক।
“আমার সামিউলের মতো যেন আর কোনো সামিউল না হারায়,” বলেন তার শোকাহত মা।
মৃত সামিউলের লাশ পোস্টমর্টেমের জন্য কুমিল্লা কুচাইতলী মেডিকেল কলেজে প্রেরণ করা হয়েছে। ঘটনার সঠিক তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।