টাকা না দিলে ফেল করানোর ভয়, পরীক্ষা ছাড়াই পাসের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ; সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক | 

রাজধানীর উত্তরা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষা ও বিভিন্ন সেবা গ্রহণকে কেন্দ্র করে ঘুষ দাবি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করিয়ে দেওয়ার নামে জনপ্রতি ৩ হাজার টাকা দাবি, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অকৃতকার্য দেখানোর ভয় এবং পরীক্ষা ছাড়াই পাস করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন।

একই সঙ্গে গাড়ির মালিক ও চালকদের বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ দেওয়ার চাপের মুখে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রত্যাশী। অভিযোগে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির নামে একাধিক বাড়ি, ভবন ও জমি থাকার কথাও উঠে এসেছে। এসব সম্পদের বৈধ উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

তবে অভিযোগগুলোর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য এখনো নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিভিত্তিক অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের দাবি উঠেছে।

৩ হাজার টাকায় পাস, টাকা না দিলে ফেল—কী ঘটছে পরীক্ষাকেন্দ্রে?

অভিযোগকারীদের দাবি, ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষায় অংশ নিতে আসা কিছু সেবাপ্রত্যাশীকে দালালদের মাধ্যমে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। জনপ্রতি ৩ হাজার টাকা দিলে পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কেউ এ প্রস্তাবে রাজি না হলে তাঁকে পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখানোর ভয় দেখানো হয়। এমনকি পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও অর্থের বিনিময়ে উত্তীর্ণ হওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয় বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

যদি এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে তা শুধু সেবাপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের প্রশ্ন নয়, বরং চালকের দক্ষতা যাচাইয়ের ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করবে।

তবে এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। কারা অর্থ দাবি করছেন? তাঁরা কি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম ব্যবহার করছেন, নাকি তাঁদের সঙ্গে কারও যোগসাজশ রয়েছে? পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারণ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম ঘটছে কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন ভুক্তভোগীদের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ, পরীক্ষার ফলাফলসংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা।

গাড়ির মালিক ও চালকদের হয়রানির অভিযোগ

উত্তরা বিআরটিএ কার্যালয়ে গাড়ির মালিক ও চালকদের বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও হয়রানি এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে কেউ কেউ অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপ অনুভব করেন। এতে নির্ধারিত নিয়মে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ বিড়ম্বনায় পড়ছেন বলে তাঁদের দাবি।

তবে কোন সেবা গ্রহণের সময়, কার কাছে এবং কী কারণে অর্থ দাবি করা হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করা জরুরি। অভিযোগের পক্ষে লিখিত বক্তব্য, অর্থ লেনদেনের রেকর্ড, বার্তা, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য কিংবা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি পাওয়া গেলে অনুসন্ধান আরও নির্ভরযোগ্য হবে।

সরকারি সেবার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি ও নিয়মের বাইরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠামাত্রই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে সত্য উদ্‌ঘাটন করাও জরুরি।

সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন, প্রয়োজন নথিভিত্তিক অনুসন্ধান

অভিযোগকারীদের বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির নামে বা তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক বাড়ি, ভবন ও জমি থাকার কথা উঠে এসেছে। এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং তাঁর ঘোষিত আয় ও সম্পদের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

তবে শুধু একাধিক বাড়ি, ভবন বা জমির মালিকানা থাকাই অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ নয়। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সম্পত্তির মালিকানা, নিবন্ধন দলিল, ক্রয়মূল্য, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী এবং বৈধ আয়ের উৎস পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

প্রাসঙ্গিক নথিতে অসংগতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আইনানুগ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যাচাইযোগ্য তথ্য ছাড়া সম্পদকে অবৈধ বলে উপস্থাপন করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

‘আগেও লেখালেখি হয়েছে, কিছুই প্রমাণিত হয়নি’—বক্তব্যের সত্যতা যাচাই জরুরি

অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে, তাঁর বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হলেও কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে।

তবে বক্তব্যটির মূল রেকর্ডিং, পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে সরাসরি উদ্ধৃতি হিসেবে প্রকাশ করা সমীচীন নয়। একইভাবে, অতীতের অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে তার ফলাফল কী, তা-ও যাচাই করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য: প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তাঁর কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো উপস্থাপন করে বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদনে যুক্ত করা জরুরি। বক্তব্য পাওয়া না গেলে যোগাযোগের চেষ্টা ও তার ফলাফল নিরপেক্ষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি কোথায়?

ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং নিয়মের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা বিআরটিএর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো পরীক্ষার্থী অর্থের বিনিময়ে ফলাফল প্রভাবিত করার প্রস্তাব পেলে কিংবা সেবা গ্রহণের সময় অনিয়মের শিকার হলে তাঁর অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

২০২৫ সালের মে মাসে বিভিন্ন বিআরটিএ কার্যালয়ে দালালদের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। এ ধরনের প্রতিবেদন বিআরটিএর সেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে অতীতের অভিযানকে উত্তরা কার্যালয় নিয়ে বর্তমানে উত্থাপিত নির্দিষ্ট অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

বর্তমান অভিযোগের বিষয়ে উত্তরা বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, অভিযোগ যাচাইয়ে গৃহীত পদক্ষেপ এবং পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ন্যায্য অধিকার ও সুনামও সুরক্ষিত রাখতে হবে।

জনস্বার্থে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

ড্রাইভিং লাইসেন্স কেবল একটি সরকারি সনদ নয়; এটি একজন চালকের দক্ষতা ও সড়কে নিরাপদে যানবাহন চালানোর যোগ্যতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। সেই প্রক্রিয়ায় অর্থের বিনিময়ে ফলাফল প্রভাবিত করার অভিযোগ সত্য হলে তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জনআস্থা এবং সড়ক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *