দুদকে অভিযোগের পরও পদোন্নতি পেলেন রাজউকের গিয়াস উদ্দিন

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে গিয়াস উদ্দিনের নাম, যিনি রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) দপ্তরে সাঁটলিপিকার-কাম-কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে প্রাপ্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ থাকার পরও তিনি এস্টেট পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। তবে পদোন্নতির প্রক্রিয়া, অভিযোগের বর্তমান অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৬ জুন তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২২ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭-এর ৮ বিধির উল্লেখ রয়েছে। স্মারক নম্বর ০০.০১.২৬০০.৬০৩.০১.০৯১.২৩-২৪০৩৮/২-সংবলিত নথিতে রাজউকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

নথিতে বলা হয়েছে, অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছিল। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন একজন অনুসন্ধান টিম লিডার এবং সদস্য হিসেবে ছিলেন দুদকের দুই উপপরিচালক—জেসমিন আক্তার ও মো. তানজির হাসিব সরকার। অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

নোটিশে রাজউকের চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে দুদকের প্রধান কার্যালয়, ঢাকায় উপস্থিত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও টিআইএন সনদের অনুলিপিসহ অনুসন্ধান দলের কাছে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টিও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এতে বোঝা যায়, সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে বক্তব্য গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে শুধু বক্তব্য গ্রহণের নোটিশ থেকে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কিংবা তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

অভিযোগকারীদের দাবি, গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ থাকার পরও তাঁকে সাঁটলিপিকার-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদ থেকে এস্টেট পরিদর্শক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তাঁর চাকরির জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা, বিভাগীয় রেকর্ড এবং পদোন্নতি-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে পদোন্নতিকে অনিয়মের ফল হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি অভিযোগের বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই না করাও কাম্য নয়।

জানা যায়, গিয়াস উদ্দিন কুমিল্লার তিতাস উপজেলার হুমায়ুন কবির পাঠানের ছেলে। গিয়াস উদ্দিনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও অভিযোগকারীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তাঁদের দাবি, অতীতে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে বিএনপির বড় নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তবে এসব দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া না গেলে তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কিংবা দলীয় পরিচয়কে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা জরুরি।

এদিকে, গিয়াস উদ্দিনের নামে রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর ১৭/৫ সি ঠিকানায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তাঁদের আরও দাবি, কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় তাঁর একাধিক জমি রয়েছে এবং ঢাকাতেও একাধিক ফ্ল্যাট থাকতে পারে। তবে এসব সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের সময়, মূল্য, অর্থের উৎস এবং তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য সম্পর্কে কোনো যাচাইকৃত দলিল এই প্রতিবেদনের জন্য সরবরাহ করা হয়নি। ফলে সম্পত্তিগুলো তাঁর মালিকানাধীন কি না কিংবা সেগুলো অবৈধ উপায়ে অর্জিত কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল, নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য, ব্যাংক লেনদেন এবং চাকরির রেকর্ড পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুদকের অনুসন্ধান-সংক্রান্ত নথিতে গিয়াস উদ্দিনের নাম নির্দিষ্টভাবে রয়েছে কি না, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলা রয়েছে কি না এবং অনুসন্ধানের চূড়ান্ত ফল কী হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি, সম্পদ অর্জন এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে যাচাই করা এবং অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। একইভাবে, অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

এ অবস্থায় দুদকের ২০২৩ সালের নোটিশে উল্লিখিত অনুসন্ধানের বর্তমান অবস্থা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি, পদোন্নতির বৈধতা এবং অভিযোগকারীদের উত্থাপিত সম্পত্তির তথ্য যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। এসব বিষয়ে দুদক ও রাজউক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং প্রামাণ্য নথি পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা আরও স্পষ্ট হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *